কল্লোলিনী

জ্যামে আটকে আছি পনের মিনিট ধরে। পাশের দোকানে গরুর মাংস ঝুলছে। সামনে ভূট্টা। একটা ছেলে বাইকে বসে দেখছে। টিশার্টের বুকে লেখা হিলফিগার। শওকত আলীর দোকানে পান বিক্রী হচ্ছে। ডঃ নঈম আশগর রুগী দেখছেন। চেক লুঙ্গি, ফেজ টুপি, সাদা দাড়ি, চশমা। চাচি ডিম পাঁউরুটি বেচছে। পাশের দোকানে আমসত্ত্ব। কার্ডবোর্ডের ভ্যান ঠেলছে দুজন। পেছনে 30টা বাইক, 200 গাড়ি, 2500 লরি, 27921টা বাস, 153450টা লোক।ইয়ে হ্যায় কলকাত্তা মেরি জান।

মানবী

আমার এক বন্ধুর কিছু ছবি দেখছিলাম কদিন। সমুদ্রের ধারে স্নানপোষাকে দাঁড়িয়ে, চুল উড়ছে… নরম রোদ এসে পড়েছে গায়ে… উন্মুক্ত কাঁধ,উরু ভিজে যাচ্ছে লোনা বাতাসে… সমস্ত মুখচোখ আনন্দে ভাসছে… দেখছিলাম আর ভাবছিলামঃ আমি কখনও এভাবে দাঁড়াতে পারিনি, বা হয়তো কোনওদিনই পারব না আমরা কেউ কেউ… অথচ চমৎকার সব শরীর ছিল, আছে, আমাদেরও। বা যদি না-ই থাকত, এ জগতের তৈরি করা চোখে যদি কুরূপা হতাম, তাহলেও কি অন্যায্য হতো এই চাওয়াটুকু? আমারই শরীর। রোদে, জলে, হাওয়ায় তাকে ইচ্ছেমতো সেঁকে নিতে, ভিজিয়ে নিতে, জারিয়ে নিতে চাওয়ার ইচ্ছেটুকু? কখনও খোলা আকাশের নীচে, উষ্ণ বালিতে, পাহাড়ের ঠাণ্ডা হাওয়ায়, ঘন জঙ্গলে বিরাট মহীরুহের ছায়ায় উন্মুক্ত শরীর মেলে শুয়ে থাকার… শুয়ে থাকা ঘাসের ওপর? একটা শরীর দিয়েছিলেন সৃষ্টিকর্তা, যে শরীরের মালিকানা আমাদের হাতে নেই। “পোষাক হবে জলবায়ু অনুযায়ী, ঋতু অনুযায়ী”। খুব সহজেই বলেছিল এক দিদি। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার রাস্তায় শর্টস আর সুতির ট্যাংকটপ পরে সাইকেল চালাত সে। ছুটির দিনগুলোয় মা বাবা বর আর ছেলের সঙ্গে বাড়ির বাগানে অঢেল রোদের মধ্যে বসে বিয়ার খেত। এসব ছবি দেখে বুকের মধ্যে চিনচিন করেনি। ঈর্ষা জিনিসটা নেই আমার। কিন্তু বিষন্ন লেগেছে। মনে হয়েছে, নিতান্ত সাধারণ উদযাপনগুলোও এখানে কী অন্যায্য যুক্তি আর শাসনের বোঝা চাপানো। কোনও অনুষ্ঠানে শরীরের কোনও উল্লাস নেই, নাচ নেই, হৈ হুল্লোড় নেই। শরীর-শরীর ছুঁৎমার্গে কেটে গেল জীবনের পর জীবন। একটা শরীর দিয়েছিলেন ঈশ্বর। যে শরীরের বাঁশিটি আমাদের হাতে নেই।মাথার ভেতর আজন্মকালের চোখরাঙানি ভর করে। গলা চেপে ধরে যখনতখন। শরীরের ভালবাসাও তার কাছে অশুচি। অথচ হাওয়া নয়, তরঙ্গ নয়… নিতান্ত হাড়-মাংস-রক্ত-মজ্জা দিয়ে তৈরি এ-শরীর। এই মন নেহাত কিছু হরমোন আর নিউরোট্রান্সমিটারের ওঠাপড়া। রাগ-দুঃখ-অভিমান-সংরাগ সবকিছুর জন্ম-কর্ম-নিরসন সব এরই মধ্যে। এমনকি একে ছাপিয়ে যাওয়ার যে ইচ্ছে, অতিমানবিক-অতিলৌকিক-আধ্যাত্মিক যা কিছু চাওয়া পাওয়া… সেসবেরও আধার, মাধ্যম এই শরীর। শ্রদ্ধা, প্রেম বাৎসল্য সবের প্রকাশ এই দিয়ে। আর তাকেই এতবড় ধোঁকা! প্রতিদিনের জীবনে অচ্ছুৎ করে রেখে দেওয়া! কাকে ঠকালাম আমরা? সেই অসভ্য গুহামানবী আমার চেয়ে, আমাদের চেয়ে সুখী ছিল। যাকে কেউ পোষাক নিয়ে, শরীরের ভঙ্গি নিয়ে চোখ রাঙ্গায়নি। ভালবাসা আর যৌনতা দুইই যার কাছে সমান স্বাভাবিক, সমান সুন্দর। যাকে কেউ নাম দেয়নি। ডাকেনি বেশ্যা, ডাইনি বলে। শরীরের সুখ-আনন্দ-উল্লাস-যাপন-উদযাপনে যাকে কারওর অনুমতি নিতে হয়নি। স্বাভাবিক যাপন যার কাছে স্পর্ধা বা স্বাধীনতা নয়।

প্যানডেমিক ৩

স্যানিটাইজারের গন্ধে আমার বমি আসত। দীর্ঘদিন আমি হাসপাতালে ছিলাম। যেখানে ছিলাম, সেখানে একটা বিশেষ স্যানিটাইজার ব্যবহার করা হতো। সেই গন্ধটা নিতে পারি না আর, তাই দুটো এক লিটারের বড় বোতল আমি বাবা মাকে দিয়ে এসেছিলাম। আমার কাছে কাজ চালানোর মতো একটা ছোট্ট বোতল আছে, ব্যাগে। দরকারে যা দু সপ্তাহ চলবে। এখন বাড়ি আছি, তাই সাবানেই কাজ চলে যাচ্ছে। আশা করি, স্যানিটাইজার আমাকে আর কিনতে হবে না। হাসপাতালের দিনগুলোর স্মৃতি আমার কাছে খুব বেদনাদায়ক না। কারণ জীবনে সবকিছুই আমি আনন্দের সঙ্গে নিতে জানি অনেকদিন হল। ওই দিনগুলোও আনন্দের ছিল। কিন্তু ওই গন্ধটার সঙ্গে অসুস্থ সন্তানের বিছানার পাশে বসে থাকা আমার বাবার ছবিটা মনের মধ্যে গেঁথে রয়েছে। রয়েছে, কোমরে আঁচল গুঁজে দৃপ্ত দাঁড়িয়ে থাকা আমার সাহসী মায়ের ঘামতেল মাখা মুখ আর স্ত্রীর রোগশয্যার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটির নীলাভ বেতের ফলের মতো দুটি চোখ।

প্যানডেমিক ২

এই ক্রাইসিস চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে। এখনও কি আপনি বুঝবেন না, গ্রামকে বাঁচাতে হবে। গরীব মানুষকে বাঁচাতে হবে আপনার স্বার্থেই? তারাই বইছে এই পৃথিবীর ভার, নিজেদের ঘাড়ে, এটলাসের মতো? তারাই উৎপাদক। তারাই ফসল ফলায়, কারখানা চালায়, শহর আর সভ্যতার কলকব্জাগুলো তাদের ঘামে, মেহনতে চলে?
পেটে টান পড়লেও বুঝবেন না? শহরের সাপ্লাই চেন শুধু কিছু ব্যবসায়ী আর নেতারা চালায় না। হাতেকলমে পথে নেমে ক্ষেত থেকে আপনার থালা পর্যন্ত খাবার, আপনার বাচ্চার মুখের দুধটুকু, আপনার বয়স্ক বাবা মার ওষুধ যারা পৌঁছে দিচ্ছে আপনি আজও তাদের কথা ভাববেন না? এই কিন্তু সময়। ভেবে দেখুন। যে রাজনীতি এদের কথা ভাবে না, সেই রাজনীতিকে বর্জন করুন।

প্যানডেমিক-১

বড়লোকরা ভেবেছিল টাকা দিয়ে সব কিনে নিতে পারবে।
ক্ষমতাবানরা ভেবেছিল চোখরাঙানি দিয়ে।
স্বার্থপররা ভেবেছিল চোখ বুজে কাটিয়ে দিলেই ব্যাস।
মৌলবাদীরা সন্ত্রাস নিয়ে ব্যস্ত ছিল শুধু।
সাদারা দুনিয়াদারি নিয়ে।
কদিন আগে দেখলাম বন্ধুতালিকায় থাকা আলপনা মন্ডল লিখেছেন, এত কিছুর মধ্যেও ওঁর পৈশাচিক আনন্দ হচ্ছে ভেবে, কলকাতার বৌদিদের বাসুন মাজবে কে! আমারও হচ্ছে আনন্দ। যদি দেখি একটাও মানুষ আর বেঁচে থাকবার জন্য পড়ে থাকছি না, খুব আনন্দ হবে আমার। পৈশাচিক আনন্দ। আফটার অল, আমি তো মানুষই। দিনের শেষে হিংস্রতম প্রাণী। আনন্দটা উদযাপন করতে পারব না হয়তো। বেঁচে না থাকলে। কিন্তু এই লক্ষ বছরের পাপের ভার নিয়ে কয়েকশ কোটি প্রাণী-গাছগাছড়া হত্যা করে, জল জঙ্গল মাটি নদী শেষ করে দিয়ে, রক্তারক্তি করে চুল ছেঁড়াছেঁড়ি করে সুপ্রিম লিডার সাজার প্রতিযোগিতাটা শেষ হবে অন্তত। প্রার্থনা করি, মহাবিশ্বে কোনও গ্রহে কোনও ইভোলিউশন এমন হিংস্র আত্মঘাতী প্রাণীর জন্ম যেন না দেয় আর।

Charioteer of Delphi

-It happened again doc!
-What happened?
-They cancelled my appointment.
-Appointment… oh, yes, you mean with the gym instructor?
-Yes
-And they didn’t give you any call?
-They didn’t give me any call.
-This time also!
-This time also.
-Did you complain?
-No
-Hmm, are you back home?
-I am.
-Why didn’t you go out? It’s Saturday evening!
-I didn’t feel like.
-Wait! Didn’t you have a party today? I remember you told me about some gathering.
-Yes
-So? Aren’t you going?
-I don’t feel like.
-Why? Isn’t it at that professor’s place that you talked about?
-Yeah!
-Why are you not going?
-I don’t know anyone there.
-That’s not a big deal. No one knows everyone in a party.
-I don’t know him.
-You spoke highly of him.
-I never met him.
-You could meet him today.
-I didn’t feel like.
-Why?
-Why do you ask me so many questions?
-Okay, I won’t ask anymore. You tell me.
-I want to tell you something.
-I’m all ears.
-Today when I was at the bus-stop, there was an auto-rickshaw standing nearby, waiting for passengers. The driver asked me, “Where to?” and I got in. A loud, heart-pounding music was playing inside. He pressed a switch and some tiny pink lamps started blinking. It was psychedelic. I looked into the mirror and saw his face. He didn’t seem to be a regular guy.
-You mean…
-Slim-built with sharp features, a noticeable moustache twitched upwards at the ends and a thick beard. His eyes were different. He had some long lashes. I looked into those eyes. They seemed to have come from another universe.
-So you were eyeing an auto driver!
-I was watching his eyes. And suddenly he caught me watching.
– Then you both started eyeing each other! Where is this story leading to?
-Listen to me doc.
-Sorry, it was a joke. Tell me.
-He saw me watching him. And I turned my eyes away. But the more I tried to look outside the more I looked at him. Quite a game! Only if I knew the rules!
-Did you like doing this?
-He was wearing some blue checked scarf around his neck. It was accentuating his look. He must’ve had taken that style from some model or superstar. In fact, he was looking as one of them. And it’s not about his style. It had something unusual about it. Those large, beautiful eyes didn’t bear any question, and they didn’t bring any answer either. Then suddenly he stopped his car. And I realised that I’ve reached the gym.
-Were you sad?
-Don’t know. I went to the gym. And they told that my appointment was cancelled. I came out. And I calculated the time the auto could take to come round.
-Aha! And you started waiting?
– No
-Then?
-I started walking on the same footpath along the lane, the lane that he would take while returning.
– He did?
-I don’t know. I looked back at every honk. I looked into every vehicle.  He wasn’t there.
-Hmm
-And I walked up to home.
-That’s quite a distance!
-It is. But you know that I love walking.
-I know.
-And here I am.
-Why did you like the guy?
-I don’t know. May be because he didn’t ask me anything.
-He did.
-He did?
-Yes you told me.
-What did he ask me?
-He said, ‘where to?’

ফসিল

একসাথে কলেজে পড়ি আমরা। ­কী পড়ি জানি না। বয়স এক রকমই আছে। কমেনি। একটা ক্লাসে সবাইকে ফাইল করে দাঁড়াতে বলা হয়েছে। রোজ এরমই বলা হয়। পরপর দাঁড়িয়ে সবাই। আমি ভীষণ হাসি-ঠাট্টা করছি, ডালিয়া আর অমৃতার সঙ্গে। হাসতে হাসতে খেয়াল থাকছে না স্যার দেখছেন কিনা। স্যার বয়স্ক মানুষ। ধুতি আর শার্ট পরে ক্লান্ত চেহারায় বসে আছেন চেয়ারে। নানা গুঞ্জন চলছে। ওঁর শরীর হয়তো ভাল নেই। হার্টের সমস্যা থাকতে পারে কিছু। চারতলার ওপরে ক্লাস। এতোটা সিঁড়ি ভেঙে টিচার্স রুম থেকে আসতে নিশ্চই কষ্ট হয়েছে। আমাকে ডাকলেন। বললেন, ‘এখানে কান ধরে দাঁড়াও’। আমি একটা আঙুল তুলে ‘একটুসখানি’ জাতীয় একটা মুদ্রা করে কাঁচুমাচু মুখে বললাম, ‘স্যার একটা সুযোগ পাওয়া যাবে?’ বললাম, যথাসম্ভব নিচু আওয়াজ করে, যাতে ক্যালরম্যালর পেরিয়ে কেউ শুনতে না পায়। উনি বললেন, ‘সুযোগ কী  পাওয়া যায়?’ আমি বললাম, ‘দশ বছর পর আমার বন্ধু অমৃতা এসছে! একসাথে ক্লাস করছি আমরা। তাই একটু ক্যারেড অ্যাওয়ে হয়ে গেছিলাম’। শুনে বললেন, ‘কী শিখলে তাহলে?’ বুঝলাম একটু আগে যে সিনেমার ক্লিপটা দেখানো হয়েছিল, সেটার কথা বলছেন। আমি ভাবলাম, ওটায় তো দেখছিলাম, গোটা সিনেমার শেষে ভিক্টর ব্যানার্জী বন্ধুদের থেকে মন সরিয়ে বলে, ‘আসলে ওই ওখানে… ওই সেখানে… উঁচু উঁচু মেঘেরা…’ অর্থাৎ মনকে রাখতে হবে তুচ্ছ মানুষিক জগতের উর্ধ্বে! আমি ভাবলাম, এটা কী “আত্মপ্রকাশ”? তারপর মনে পড়ল, ও না না। এটাই তো “সীমাবদ্ধ”! এবং ভাবলাম সিনেমার নামটা তাহলে এই কারণেই রাখা হয়েছে? “কোং লিমিটেড” আসলে মানসিক সীমার দৈন্য? এবং দেখলাম স্যার আমায় ছেড়েও দিলেন… বা র‍্যাদার আমার দিকে আর মন থাকল না ওঁর। ততোক্ষণে ক্লাস শেষ হয়ে গেছে। আমার মন খারাপ হয়ে গেল। আমি ওয়াশরুমে গেলাম। বাকি ক্লাস ততোক্ষণে বেরিয়ে অন্য বিল্ডিঙে চলে গেছে। বসে আছ ফাঁকা ক্লাসে শুধু তুমি। ছাইরঙা টিশার্ট আর না কামানো দাড়ি নিয়ে। একলা। আমি ফ্রেশ হতে গেছি, কারণ জামাটাও পাল্টাতে হবে। বাড়ির জামা পরেই চলে এসেছি ক্লাসে বুঝিইনি সেকথা! একটা আধ-ভাঙ্গা মতো বাথরুম। অনেকগুলো পার্টিশন। একটার সামনে একটা কুমীরের ফসিল জাতীয় কী পড়ে আছে! সেটা কাঠের কোনও ভাস্কর্য নাকি সত্যিই ফসিল বুঝতে পারছি না। একটা টয়লেটে ঢুকে পড়ে তারের ওপর একে একে জামাগুলো মেলতে থাকি। এক এক করে পরতে থাকি। এবং এটা খুব মন দিয়ে করি। কারণ বুঝেছি যে এই কাজগুলো করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। কোনও বোতাম আটকাতে পারছি না। জামা পরে বাইরে এসে দেখি একটা আধো অন্ধকার মতো ভাঙাচোরা ঘরে, পর্দা টানা, খাট পাতা। সেখানে খাটের ওপর আমার ব্যাগ রাখা। মোবাইলও। আমার মন ভার হয়ে আছে। আমি জড়ো করে নিচ্ছি নিজেকে একে একে। উঁকি দিয়ে বাইরে দেখছি, আর একটা ছোট ঘড়িয়ালের মতো কুমীর। কখন চুপিসাড়ে এসছে। বুঝতে পারছি, কোনও একটা ওপেনিং দিয়ে গঙ্গার সঙ্গে কানেক্টেড এই কলেজ বিল্ডিংটা। যেখান থেকে বুঝতে না পেরে এরা এভাবে চলে আসে। আর তারপর এই পরিত্যক্ত, স্যাঁতসেতে, অন্ধকার, শ্যাওলা ধরা বাথরুমের কাছে পড়ে থেকে থেকে, খাবার না পেয়ে, গরমের বা পুজোর ছুটির ভ্যাকেশনে আন-নোটিস্‌ড থেকে এক সময়ে মরে ফসিল হয়ে যায়।

বাইরে থেকে একটা আওয়াজ আসছে। একটা মৃদু চাপড়। অরুণাভ ডাকছে আমাকে। ও-ও ক্লাসে যায়নি তার মানে এতোক্ষণ। আমি দেখছি আমার মোবাইলেও ওর মিস্‌ড কল। ছবি সমেত জেগে আছে। মোবাইলটা নিশ্চুপ ছিল। আমি বাইরে বেরোই। ও বলে, এই ক্লাসটা আর করবে না। রেস্ট-রুমে যাচ্ছে। আমি বেরিয়ে এসে দেখি তুমি তখনও বসে। আমি জানি তুমি আমার জন্যেই বসে আছ এতোক্ষণ। কিন্তু বুঝতে পারি, তোমাকে ডাকা যাবে না। তোমার ওই দেহভঙ্গিমাটিই বলে দিচ্ছে সে-কথা। পরের ক্লাসটা এন্টোমলজির। আমি বারান্দা পেরিয়ে যেতে যেতে দেখি, গোটা ক্লাস উপচে পড়েছে। তুমি ক্লাসে ঢুকে গেছ। কাউকেই চেন না প্রায়। কিন্তু আজ একদম মরিয়া। ক্লাস করবেই। কোথাও বসবে না কারওর সাথে। তাকাবে না কারওর দিকে। বারান্দাতেও চেয়ার পেতে চার্ট হাতে বসে আছে ছেলেমেয়েরা। আমি পাশ দিয়ে যেতে যেতে দেখি, একটি মেয়ে পেনসিল দিয়ে দাগ দিচ্ছে একটা পোকার থোরাসিক একটা লোবে। সেটাকে নাকি অ্যামানাটা বলে। স্যার এগিয়ে আসছেন তার সাথে কথা বলবেন বলে। সে সম্ভবত এই অ্যামানাটা নিয়ে শরদিন্দুর কোনও একটা গল্পের রেফারেন্স দিয়েছিল, যেটা স্যার বুঝতে পারেননি। এবং সেটাই তিনি ঈষৎ লজ্জার সাথে বলছেন, যে, তাঁর তো সাহিত্য তেমন পড়া নেই। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিই তোমাকে একবার চকিতে। দেখি তুমি আমারই দিকে ফিরে আমার চোখের দিকে না তাকিয়ে কী একটা স্লাইড দেখছ… সম্ভবত অ্যামানাটার কোনও একটা হিস্টলজিকাল স্লাইড। আমি বুঝি, তোমার সঙ্গে চোখাচোখি হওয়ার নয়। দ্রুত করিডোর পেরিয়ে যাই।

ঘর

ভেবেছিলাম মশার কামড়। তারপর বুঝলাম, না। প্রথমে গোটা পায়ের তলা, তারপর ওপর পিঠে আঙুলগুলো, তারপরে অন্য পায়ের পাতাটাও চুলকাতে শুরু করল। আস্তে আস্তে বিজবিজ করে জলঠোসকার মতো গুটি গুটি বের হয়ে গেল। দুটো পা-ই লাল। চমৎকার দেখাচ্ছে। মাটির পায়ের মতো। ওপরের বার্ণিশটা অসমান। একবার তারাপীঠ গেছিলাম। মূর্তির সামনে যেতে না যেতেই এক পূজারী আমার দুটো হাত জড়ো করে একজোড়া পায়ে ঠেকিয়ে দিয়েছিল। পা মানে শুধু দুটো পা। ছোট হলে বীভৎস লাগত। একটা বই ছিল ছোটবেলায়। তাতে একটা ছবি ছিল ছিন্নমস্তার। কবন্ধ, তার গলা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে। মামা বলেছিল মেন অ্যাওর্টা কেটে গেলে অমন রক্ত বের হয়। ভেবেছিলাম বড় হয়ে গেছি, বাঁচা গেছে। আর কখনও এমন ছবি দেখব না। অথচ হল ঠিক তার উল্টো। দু’দিন অন্তর দেখলাম পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের গলা কাটা যাচ্ছে। খবরের কাগজ পড়া বন্ধ করে দিলাম। এখন নেটে  কুকুর আর বিড়ালের ছবি দেখি শুধু।

            চুলকানিটা বাড়ছে। তার মানে ছত্রাক ধরল কোনও। যেমন আশঙ্কা করেছিল সকলে। আস্তে আস্তে আমার ইমিউনিটি কমবে। আমার রক্তকণিকাগুলো কমছে তার মানে। সেদিন রাতে স্বপ্ন দেখলাম একটা পাইপের মতো শিরা দিয়ে অনেকগুলো চ্যাপ্টা লোহিতকণিকা নামছে। ঠিক যেমন ওয়াটার কোস্টারে নামে মানুষ, নিকো পার্কে গিয়ে। হঠাত একটা দামড়া নিউট্রোফিল এসে কটা লোহিতকণিকাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। ওরা সাথে সাথে সরু ডাম্বেলের মতো হয়ে সুড়ুত করে নেমে গেল। শিরাটা আমার মস্তিষ্কের একটা খুব ছোট্ট রক্তজালকের। ভাবতেই ঘুমটা ভেঙে গেল।

            যে একটা দিন আই সি ইউ তে ছিলাম, নার্সদের চিৎকারে ঘুম আসেনি। আই সি ইউ এর সবার মধ্যে আমিই ছিলাম সবচেয়ে সুস্থ। বাকিরা অজ্ঞান। বাকিদের অবস্থা আমার চেয়েও সঙ্কটজনক। আমার ইচ্ছে করছিল নার্সদের ডেকে মাথায় চাঁটা মেরে বলি, এটা কি নাইট্যশালা? আমার নাকে নল। জিভে জড়িয়ে আছে তার একটা অংশ। কথা বলতে গেলে মনে হচ্ছে ভেঙাচ্ছি। পরদিন ডাক্তার আসবে যখন দেব নালিশ ঠুকে। তারপর দেখি নার্সগুলো চীৎকার করে পড়াশোনা করছে। অবাক হলাম। একটারও বয়স তিরিশ পেরোয়নি। বেশিরভাগই অবিবাহিত। আর অনেকে ছেলে। আমার সম্পর্কিত বোন, খুবই ভাল মেয়ে, এক সময় পড়িয়েছি তাকে, নার্সিং পাশ করে এখন একটা সরকারি হাসপাতালের মেট্রন-এই অল্প বয়সেই। ও শুনলে চোখ কপালে তুলবে এতজন মেল নার্স আছে এখানে! আর কেউ বাঙালি নয়। সব দক্ষিণ ভারতের। বাঙালি ছেলেরা না খেয়ে থাকবে তবু কেউ নার্স হবে না। তাদের মা-বাবা অসুস্থ হলে তারা হাগুমুতু পরিস্কার করবে না। করবে তাদের বউরা।  বউ অসুস্থ হলে কে করবে কে জানে! বউ এর মা বোধ হয়। আর বউয়ের যদি মা না থাকে? ভাবতে ভাবতে আমার ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসে। আমার পিঠে এখনও একটা চ্যানেল করা আছে। সেখান দিয়ে ব্যথার ওষুধ চলছে। সেটায় খুব ঘুমও পায়।

            পরদিন আমাকে সার্জিকাল বেডে চালান করা হল। ডাক্তার এসে বলে গেল- তুমি তো দারুণ শক্ত। স্পীডি রিকভারি হচ্ছে। আজ নামবে। নেমে হাঁটবে। আমার বয়স এমনিই কম লাগে এখন হাসপাতালের পোষাকে আরও কমবয়েসি দেখাচ্ছে। আমায় কেউ তাই আপনি বলে না। একটা অন্তত দশ বছরের ছোট নার্স এসে আমায় বকাবকি করে বলল, নীচে নামতেই হবে, বুঝলে? ট্যাঁ ফো করবে না। আমার বিছানাটা এখনও পুরো শোওয়ানো নেই। আধশোয়া করা। নামতে গিয়ে ব্রহ্মাণ্ড দুলে উঠল। মেয়েটা রামধাতানি দিয়ে আমায় নামিয়ে দিল। হাঁটতে শিখলাম তারপর।

            আমার উল্টোদিকের বেডে একজন সারাদিন সারারাত বসা। তাঁর শোওয়া বারণ। মাঝে মাঝেই তিনি কাকুতি মিনতি করছেন বিছানাটা একটু হেলিয়ে দেওয়ার জন্য। তাঁর পাশে এক বৃদ্ধা ঠাকুমা। ভীষণ গপ্পে। আমুদেও। এঁরা অনেকদিন ধরে আছেন এখানে। তাঁর উল্টোদিকে আর এক বৃদ্ধা। তিনি চুপচাপ, কম কথা বলেন। মাঝে মাঝেই উঠে বসে স্পাইরোমিটারে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করেন। তাঁর পাশে যিনি, সেই সুনীলবাবুই হচ্ছেন আসল লোক। যাঁকে দেখতে মাঝেমধ্যেই এখানে ভিড় জমে। সুনীলবাবুর কনফিউশন হয়েছে। ডাক্তারি পরিভাষার কনফিউশন। এমনি কনফিউশন হলে কেউ আর দেখতে আসত না। যেমন আমাকে বা আমাদের বাকিদের কেউ দেখতে আসছে না। সুনীলবাবু থেকে থেকে চীৎকার করে উঠছেন, রেখা! রেখা? কোথায় যাচ্ছ সারাক্ষণ। মেরে তোমার ঠ্যাঙ ভেঙে দেব। উল্টোদিকের ঠাকুমা বলছেন, উঃ ঘাটে এসে উঠেছে। এখনও বউকে তম্বি করছে। আজও সারারাত জ্বালাবে দেখবে, ঘুমাতে দেবে না। সত্যিই সারারাত সুনীলবাবু তাঁর স্ত্রী রেখার সাথে হাটে, ঘাটে, মাঠে ঘুরে বেড়ালেন। সিনেমা দেখলেন, আলুকাবলি খেলেন। আর আমরা বাকি সবাই ওঁর বাড়ি পাহারা দিলাম। না ঘুমিয়ে।

            পরদিন ডাক্তার এলে নালিশ ঠুকলাম। ভাবিনি, আমি এতটা শয়তান হতে পারি। এমনিই বলে ছেলেদের মন খানিক উদার হয়। আমার ধারণা ছিল, আমি তার মধ্যেও একটু বেশিরকম। মানুষের বিপদে আপদে পাশে থাকি। দশ টাকা চাইলে একশ টাকা দিই। কী খাচ্ছি না খাচ্ছি হিসেব করি না। সামান্য জিনিসেই আমার প্রশান্তি লাগে। এখন দেখছি তেমনটা নয়। একটু বেলার দিকে নার্স এল সুনীল বাবুর হাতের চ্যানেলটা পাল্টাতে। ব্যথায় উনি উঃ করে উঠলেন। আমার আরাম লাগল। মনে হল বেশ হয়েছে। আমি কি অমানুষ হয়ে যাচ্ছি? আমি শুয়ে শুয়ে কাঁদছি। ছোট নার্সটা এসে আমায় জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে বল তো? ব্যথা করছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। নার্স আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। আতান্তরে পড়েছি বলে একটা অচেনা অল্পবয়েসি মেয়েও আমাকে করুণা করছে। দুম করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। এমনি সময় হলে পারত? আমি যদি দীপার সঙ্গে ঝগড়ার পর বাসে উঠে বসে কাঁদতাম, যেমনটা আমার কয়েকবার হয়েছে, আর তখন যদি এই মেয়েটা পাশেই দাঁড়িয়ে থাকত, আমি মনে মনে শতবার চাইলেও এই মেয়েটা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিত?

            ভিজিটিং আওয়ার্স শুরু হয়ে গেছে। এক দুই করে লোক আসছে সবার। আমার কেউ আসছে না। চারটে থেকে শুরু হয়েছে। এখন চারটে কুড়ি বাজে। আর মাত্র চল্লিশ মিনিট। বাবা এসে ছলছলে চোখে দাঁড়াল। বাবাকে দেখলেই বিরক্ত লাগে আজকাল। কোথাও সময়ে পৌঁছতে পারে না। ছেলে হাসপাতালে ভর্তি। সেখানেও লেট। ভাইটাও কী শয়তান। বুড়ো বাপকে পাঠিয়ে রাজা উজির মারছে। বাবা কানে প্রায় শোনা না। এখন সব চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে হবে। আমার পেটে জোরই নেই চ্যাঁচানোর। ফলে বাবা বসে রইল বাবার মতো। আমি শুয়ে থাকলাম আমার মতো। দীপা এখন যদি আসে? বাবা কি উঠে যাবে? দীপার আজ খুব চাপ থাকে। আজ বৃহস্পতিবার। কিন্তু আমি জানি শত চাপেও দীপা ঠিক ম্যানেজ করবে আমার জন্যে। আই সি ইউ তে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। দীপার সঙ্গে দেখা হয়েছে সেই অপারেশনের দিন সকাল। ও নিশ্চই আসবে। ভাবতে ভাবতে মা এসে গেল। এরা একসাথে আসছে না কেন! মাকে দেখলাম হেবি স্মার্ট হয়ে গেছে। প্রমাদ গণেছিলাম এসে কান্নাকাটি করবে। অথচ দেখলাম… মা বলল, ভাই কাল সারারাত ছিল বসে, বাইরে। সকাল দশটায় বাড়ি গেছে। বাবা সকাল দশটা থেকে এখানে বসে। কখন ভিজিটিং আওয়ার্স শুরু হয়েছে টের পায়নি। চোখ লেগে এসছিল। এ কথা সে কথার পর সবাই চলে গেল। দীপা এল না।

            আমায় জেনারেল ওয়ার্ডে দেওয়া হবে এখন। ঠাকুমা বললেন, ছুটি হয়ে গেল ভাই? বেডে চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। সিনেমার শটের মতো করিডোরে আলোগুলো সরে যাচ্ছে্ মাথার উপর। জেনারাল বেডের পাশেই বাচ্চাদের ওয়ার্ড! দেওয়ালে গ্রাফিতি। টিভিতে কার্টুন চলছে। আমাদের ঘরে তিন-তিন ছয় বেড। আমার সামনের ভদ্রমহিলা বাংলাদেশ থেকে এসছেন। যদিও তিনি যে মহিলা সেটা বুঝতে সময় লাগল। অসুখ তাঁর সব কেড়ে নিয়েছে। তাঁর স্বামী রোজ সকালে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বাংলাদেশে ফোন করেন। তাঁর একজন শ্যালিকা আছে। তাঁর সম্পর্কে আকথা কুকথা বলেন কাউকে। আজ তাঁর শাশুড়ি আর ছোট শালি আসবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা এসে পড়ল। মেয়েটা এসে জামাইবাবুকে কদমবুসি করল। লোকটা বদ। ছোট মেয়েটাকে নিয়ে খেতে গেল। মুখচোখের ভাব দেখে ভাল লাগল না। মেয়েটা যাওয়ার আগে অবধি আমাকে নানান অছিলায় দেখল। সম্ভবত এই প্রথম ভারতে এসছে। ঝলমলে একটা পোষাক পরা। মাথায় ওড়নাটা ঘোমটার মতো দেওয়া। দেশে হয়তো পর্দা করে বেরোয়। কেন জানি না এটা মনে হল। নাও হতে পারে। মেয়েটার দৃষ্টির মধ্যে একটা পর্দার আড়াল থেকে দেখবার মতো আড়ষ্ট উঁকিঝুঁকি আছে। নাকি সেটা আমায় দেখবার সময়ই হচ্ছিল শুধু, কে জানে! আমার আর এখানে থাকতে ভাল লাগছে না। আজ ডাক্তার এলে বলব আমায় ছেড়ে দিতে।

             একটা হুইল চেয়ারে বসিয়ে নিয়েছে আমায় এরা। ছোটবেলায় এমন চাকা লাগানো একটা চেয়ারে বসে খেলতাম আমি আর ভাই। আরও চার মাস বাড়ি থাকতে হবে আমাকে। হাসপাতালে আসতে হবে আরও ছ’বার। ভাই সঙ্গে আছে। চোখাচোখি করছে না যদিও। সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত। বাচ্চাদের ওয়ার্ডের সামনে দিয়ে চলে গেলাম। একটা বাচ্চা কাঁদছে চীৎকার করে, মা আমি আর করব না মা। আমি বাড়ি যাব। আমি আর করব না। আর করব না।

আমার ছুটি হয়ে গেছে। বাড়ি যাচ্ছি। আমার নিজের ঘরে। আমার ঘরের বইরা জেগে আছে। নতুন নতুন বই এসছে কত। আমি গন্ধ শুঁকব তাদের।  জানালা দিয়ে পেয়ারা গাছটা দেখতে পাব। নারকোল গাছের ছায়া এসে দোল খাবে বিছানায়। একটা সবুজ  গোল কুবোপাখি বসে ডাকবে পাঁচিলে। শালিখ আর চড়ুইদের মারপিট হবে পেয়ারা নিয়ে। লেবুপাতার রঙ জুড়ে থাকবে বাগানময়।